আমাজনের জঙ্গলে খোঁজ মিলল বিলুপ্ত এক সভ্যতার! একসময় ছিলো লক্ষ লক্ষ মানুষের বাস, এত দিনের অনুমান ভাঙল সাম্প্রতিক গবেষণায়
দক্ষিণ-পশ্চিম আমাজ়নে প্রায় ১ লক্ষ ৮৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছিল এই সভ্যতা। গবেষকদের অনুমান, এককালে সেখানে ১২.৫-৩০ লক্ষ মানুষের বাস ছিল।
রিসাইটাল স্ফেরিকাল ডট ওআরজি ডিজিটাল ডেস্ক : ইউরোপীয়রা তখনও পৌঁছোয়নি দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে আনুমানিক ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আমাজনের জঙ্গলে গড়ে উঠেছিল এক উন্নত সভ্যতা। ছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের বাস। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় তেমনটাই উঠে এসেছে।
১৪৯৮ সালে দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে পৌঁছোন ইতালীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস। তার বছর ছয়েক আগে ১৪৯২ সালে তিনি আবিষ্কার করেন আমেরিকা। কলম্বাস আমেরিকা খুঁজে পাওয়ার আগের সময়কালকে বলা হয় প্রাক-কলম্বীয় যুগ।
গবেষকদের দাবি, দক্ষিণ-পশ্চিম আমাজনে প্রায় ১ লক্ষ ৮৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে গড়ে উঠেছিল ‘অ্যাকুইরি সভ্যতা’ যেখানে একসময় প্রায় ১২.৫-৩০ লক্ষ মানুষের বাস ছিল বলে অনুমান করে গবেষকরা। ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞদের এই গবেষণাটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার’ জার্নালে।
হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা আমাজনের জঙ্গলের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে ৪০০টিরও বেশি ধ্বংসাবশেষ চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে কিছু ঘরবাড়িও ছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে তাঁরা আকাশ থেকে আমাজন অরণ্যের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে লেসার স্ক্যান করেন। এর জন্য ‘লাইডার’ (লাইট ডিটেকশন অ্যান্ড রেঞ্জিং) পদ্ধতি ব্যবহার করেন তাঁরা। তা থেকে গবেষকদের দাবি, ওই অঞ্চলে আনুমানিক ২০ হাজারেরও বেশি মাটির ঢিবি ছিল। এবং সেগুলি ছিল মানুষের তৈরি। এর মধ্যে কিছু মাটির ঢিবি ছিল প্রায় ১২৪ একর এলাকা জুড়ে।
স্ক্যান এবং রেডিয়োকার্বন ডেটিং থেকে গবেষকদের অনুমান, ওই অঞ্চলে ১২.৫-৩০ লক্ষ মানুষের বাস ছিল। বস্তুত, আমাজ়ন অরণ্য মোট যে পরিমাণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে, তার মাত্র তিন শতাংশ এলাকাতেই এই গবেষণা চলেছে। তাতেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে প্রাক-কলম্বীয় যুগের আমাজ়ন নিয়ে এত দিনের ধারণা। বিজ্ঞানীদের এত দিনে অনুমান ছিল, প্রাক-কলম্বীয় যুগে আমাজ়ন অঞ্চলের জনসংখ্যা এক কোটির মধ্যে সীমিত ছিল। তবে নতুন আবিষ্কার ইঙ্গিত করছে, প্রাচীন আমাজনে মোট জনসংখ্যা কয়েক কোটিও হতে পারে। হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তথা গবেষকদলের প্রধান মার্টি পার্সিনেনের কথায়, “এই আবিষ্কার আমাজ়ন অঞ্চল প্রসঙ্গে আগের সব ধারণাকে বদলে দিয়েছে।”
এই ‘অ্যাকুইরি সভ্যতা’ কেমন ছিল, তারও একটি আভাস মিলেছে সাম্প্রতিক গবেষণায়। যদিও বেশির ভাগই এখনও অজানা। গবেষণায় দাবি, প্রাচীন এই সভ্যতার মানুষেরা ভুট্টা, স্কোয়াশ, ম্যানিওক (এক ধরনের সবজি)-এর চাষ করত। ছিল প্রশস্ত রাস্তা। চাষাবাদের পাশাপাশি উদ্যানপালনও করত তারা। এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভাবে বড় বড় পাথর খুব বেশি পাওয়া যায় না। ফলে ‘অ্যাকুইরি সভ্যতায়’ কোনও পাথরের ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায় না। এখানে যে ধ্বংসাবশেষগুলি মিলেছে, তা সবই মাটির। সন্ধান মিলেছে জ্যামিতিক নকশার বিভিন্ন মাটির কাজও। তা ইঙ্গিত দেয়, প্রাচীন এই সভ্যতার জনগোষ্ঠী বেশ সমৃদ্ধ এবং সুসংগঠিত ছিল।
তবে ৮৫০ সালে কী কারণে এই সভ্যতা আচমকা ভেঙে পড়ল, তা এখনও অস্পষ্ট। ঘটনাচক্রে, প্রায় একই সময়ে (৭৫০-৯০০ সালে) মধ্য আমেরিকার মায়া সভ্যতাও ভেঙে পড়ে। দুই সভ্যতার প্রায় একই সময়ে ভেঙে পড়া কি শুধু কাকতালীয়? এই উত্তরও অধরা গবেষকদের কাছে। এ বিষয়ে আরও বিশদ গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
তথ্য ও ছবি : সংগৃহীত

